THE LAST BARGAIN কবিতাটি প্রাচ্যের এক বিশেষ জীবন দর্শনের উপর ভিত্তি করে রচিত । রবীন্দ্রনাথের লেখায় প্রাচ্য দর্শন বহূলভাবে উঠে আসাতে রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি মানুষ না থেকে সমগ্র ভারতীয় দর্শনের একজন প্রতিনিধি রূপে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি যতটা না রবীন্দ্রনাথের তার থেকে ঢের বেশি ভারতীয় দর্শনের । তাই রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতা শুধু রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতা না হয়ে হাজারো মানুষের হয়ে যায়, যাঁরা বিশ্বাস রাখেন সেই একই জীবন দর্শনে যেটিতে রাখেন রবীন্দ্রনাথের কবিস্বত্বা । দর্শন যে কি নিপুন ভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়-সাহিত্যে নিজের স্থান করে নিয়েছিল তার অন্যতম একটি উদাহরণ আলোচ্য কবিতাটি ।

যে জীবনের আভাস আমরা এই কবিতায় পাই তা সাধারণ মানুষের জীবন নয়, এ জীবন সুখের নয়, দুঃখের নয়, বেঁচে থাকার নয়, ধন-সম্পত্তির নয়, সম্মানের নয়, প্রতিপত্তির নয় । তাহলে কিসের ? কি চান কবি ? মানুষের জীবনে কি এর থেকে বড় কিছু পাওয়ার আছে ? হেসে বেঁচে থাকা, এই কি জীবন নয় ? বেঁচে থাকতে কি টাকা লাগেনা ? এমনকি সম্মানও না ? তোমরা যারা লেখাপড়া করছ, বেঁচে থাকার সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছ, কীভাবে কতক্ষন ঠিক কেমন করে পড়লে চাকরি জুটতে পারে এটা নিয়ে ভাবছ, একটা নিরুপদ্রপ শান্তি পূর্ণ জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছ তাদের মনে এইসব প্রশ্ন আসাটা খুব স্বাভাবিক । চার স্তবকের এই কবিতাটি পাঠ করে এইসব প্রশ্নেরই উত্তর আমরা পেতে চলেছি । তাহলে,চল শুরু করি...


Image result for the last bargain


The Last Bargain

"Come and hire me," I cried, while in the morning I was walking on the stone-paved road.
Sword in hand, the King came in his chariot.
He held my hand and said, "I will hire you with my power."
But his power counted for nought, and he went away in his chariot.

In the heat of the midday the houses stood with shut doors.
I wandered along the crooked lane.
An old man came out with his bag of gold.
He pondered and said, "I will hire you with my money."
He weighed his coins one by one, but I turned away.

It was evening. The garden hedge was all aflower.
The fair maid came out and said, "I will hire you with a smile."
Her smile paled and melted into tears, and she went back alone into the dark.

The sun glistened on the sand, and the sea waves broke waywardly.
A child sat playing with shells.
He raised his head and seemed to know me, and said, "I hire you with nothing."
From thenceforward that bargain struck in child's play made me a free man.



প্রথম স্তবকঃ কর্ম সন্ধান

"Come and hire me," I cried, while in the morning I was walking on the stone-paved road.
Sword in hand, the King came in his chariot.
He held my hand and said, "I will hire you with my power."
But his power counted for nought, and he went away in his chariot.

কোনো এক সকাল বেলায় (হতে পারে জীবনের শুরুতে) পাথরবাঁধানো রাস্তায় কবি নিজেকে বিজ্ঞাপিত করলেন, চিৎকার করে বললেন, আসো, আমাকে কাজে রাখো । কবির চিৎকারে সাড়া দিয়ে রাজা এলেন রথে করে, তরবারি তাঁর হাতে । কথকের হাত ধরে বললেন, আমি তোমাকে কাজে নেব আমার শক্তির বিনিময়ে । কিন্তু তাঁর শক্তি সব কবির কাছে শূন্যসম, রাজা চলে গেলেন ।

রাজার শক্তি, ক্ষমতা মুহূর্তের মধ্যে কবি শূন্য করে দিলেন । যার বিক্রমে দেশ চলে, যার এক ইশারায় যে কারো মুণ্ডচ্ছেদ হতে পারে, হাজারো মানুষের উপর হুকুম খাটানোর ক্ষমতা যার রয়েছে তাকে কিছুই না বলে বিদায় করে দেওয়া সহজ কথা নয় । এতটুকু পড়ে আমাদের এতটুকু ধারণা জন্মে যে কথক পার্থিব কিছু নয় বরং তার থেকে বেশি কিছুই খুঁজে চলেছেন । এই অনুসন্ধান বজায় থাকে দ্বিতীয় স্তবকেও ।

দ্বিতীয় স্তবকঃ

In the heat of the midday the houses stood with shut doors.
I wandered along the crooked lane.
An old man came out with his bag of gold.
He pondered and said, "I will hire you with my money."
He weighed his coins one by one, but I turned away.

বেলা দুপুর । গরম পড়েছে । সারি সারি বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে । দরজা বন্ধ । আঁকাবাঁকা গলি হয়ে হেটে চলেছেন কবি । সহসা এক বৃদ্ধ এলেন, হাতে তাঁর স্বর্ণে ভরা থলি । বললেন, তোমাকে আমি কাজে নেব অর্থের বিনিময়ে । বৃদ্ধ মুদ্রার ওজন নিতে থাকলেন, কবি সরে এলেন অন্যত্র । কবির চাওয়া আরও যেন স্পষ্ট হল, যা অনুসন্ধান করছেন সেটা যে টাকা, পয়সা, প্রতিপত্তি কিছুই নয় সেটা স্পষ্ট হল । মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি কবি সুখ চান, হাসি চান, খুশি চান ?

তৃতীয় স্তবকঃ অনন্য অভিজ্ঞতা

It was evening. The garden hedge was all aflower.
The fair maid came out and said, "I will hire you with a smile."
Her smile paled and melted into tears, and she went back alone into the dark.

কবির অনুসন্ধান এখনো জারি । এখন সন্ধ্যা । বাগান ফুলময় । সুন্দর এক তরুণী এসে বলল, আমি তোমাকে নেব আমার হাসির বিনিময়ে । কবি হয়তো ভাবছিলেন কিছু, নাকচ করতে পারেননি । তাহলে বোধয় তিনি পেয়ে গেছেন যার অনুসন্ধান তিনি করছিলেন । হাসি, অনন্য এই হাসি । সুন্দর হাসে, আনন্দ হাসে, সুখ হাসে । যশ নয়, সম্পদ নয়, এই দুনিয়ায় যা কিছু চাওয়ার তা হল আনন্দ, সুখ, হাসি । কবি ভাবছিলেন হয়তো এসব অথবা ভাবার সময় হয়ে ওঠার আগেই, রূপবতী রমণীর হাসি ম্লান হতে হতে কান্নায় ভেঙে পরিণত হল । রূপ অস্থায়ী । নিজে থেকেই চলে গেল সে একাকি আঁধারে । স্পষ্ট হল, পাঠকের কাছে যেমন কবির কাছেও ঠিক তেমনি । হাসি নয়, সৌন্দর্য নয় । এর সাথে মানুষের কর্মের বিনিময় হতেই পারেনা । একটা বাড়তি প্রশ্ন জাগে, কে এই রমণী ? কবির বিবাহিতা স্ত্রী? কবি কি তাহলে যা লিখছেন তা স্রেফ একজন বিবাহিত পুরুষের কথা, যার সুন্দরি স্ত্রীর রূপে ভাঁটা পড়েছে? আপাতত সে প্রশ্ন থাক, ফিরে আসি আমাদের আলোচনায় । কবির অনুসন্ধান থেমে যায়নি, চলছে ক্রমশ ।


চতুর্থ স্তবকঃ শ্রেষ্ঠ চুক্তি লাভ


The sun glistened on the sand, and the sea waves broke waywardly.
A child sat playing with shells.
He raised his head and seemed to know me, and said, "I hire you with nothing."
From thenceforward that bargain struck in child's play made me a free man.

এখন রাত নয়, পূর্ববর্তী স্তবকের সন্ধ্যার পর অন্য কোন দিনের কথা । আকাশে সূর্য । সূর্যের আলো এসে বালুচরে পড়ছে । চকচক করছে । সমুদ্র আপন মনে ঢেউ দিচ্ছে । তারই মধ্যে কোথাও ছোট্ট এক শিশু বসে shell নিয়ে খেলা করছিল । মাথা তুলে এমন ভাবে চাইল যেন কথক তার পূর্বপরিচিত । বলল, আমি তোমাকে কাজে নিলাম কিচ্ছু না দিয়েই । খেলার ছলে হওয়া সেই চুক্তির পর থেকে কবি এখন মুক্ত এক মানব ।

অবশেষে স্পষ্ট হল, কবি যার বিনিময়ে কাজ করতে চান তা হচ্ছে কিচ্ছু না চাওয়া । কিচ্ছু না পাওয়া । কাজের জন্য কাজ । যা কর্তব্য তাই করতে হবে । এই কথা কার ? ভগবত গীতার রচয়িতাও একই কথা বলিয়েছেন কৃষ্ণ চরিত্রের মুখ দিয়ে । এখানে এসেই একটি গীতি কবিতা একটি সর্বজনীন কবিতার রূপ পেল । কিন্তু কে এই শিশু যে সমুদ্রের পাড়ে খেলা করে ? শহরের পথ থেকে হঠাৎ করে কীভাবে কবি চলে এলেন সমুদ্রের পাড়ে ? কবির এ কোন শহর ? কোন পথ ? কোন বাগান ? আত্মচেতনা । জীবন জুড়ে চলেছে কবির অনুসন্ধান । শুরুর দিকে হয়ত নিজেকে খুঁজেছেন নাম-যশ-কীর্তিতে, কিন্তু সহজেই ভেঙে যায় সে মোহ । তাহলে জীবন কোথায় ? ধন-সম্পদে ? স্বেচ্ছায়-অনিচ্ছায় সোনা হাতে করে কোনো বৃদ্ধ আসেন কবির জীবনে । কেন তিনি বৃদ্ধ ? কবি কি ধনের প্রতীক রূপে পিতাকে কল্পনা করেছেন ? যাহোক এইসব তুচ্ছ বিষয়ের পর যার আগমন হল তিনি নারী, নিজে থেকে সরে গেলেও এই নারীর যে অবদান রয়েছে কথককে চিন্তা-চেতনায় বিকশিত করতে তা অস্বীকার করা চলেনা । এই রূপবতী নারীই কবির অন্তরে সুন্দরের চেতনা জাগ্রত করেন ।

অবশেষে শিশুকে প্রকৃতি রূপে কল্পনা করে তার সেবায় নিজেকে নিবেদন করেন, যে নিবেদনের বিনিময়ে তিনি কিছু পাবেননা কখনো; সব চাওয়া আর পাওয়ার সম্ভাবনা ফুরিয়ে যেতেই কবি হয়ে উঠলেন এমন এক মানুষ যে সমস্ত রকম ভাবে মুক্ত, স্বাধীন । খুঁজে পেলেন নিজ জীবনের মানে, উদ্দেশ্য, সব কিছু । কবি কাজ নিলেন চিরন্তন শূন্যতা ও অনন্ত সময়ের কাছে । অন্বেষণ হল সাঙ্গ ।

মানব সভ্যতা ক্রমশ প্রকৃতি বিমুখ হয়ে চলেছে, প্রকৃতি বিমুখতা মানেই অতৃপ্তি । রাজার ক্ষমতা একসময় কবির কাছে শূন্য মনে হয়েছিল, অবশেষে কবি শূন্যতাতেই তৃপ্ত হলেন । শূণ্যতা মানে কিচ্ছু নেই আবার শূণ্য থেকেই মহাবিশ্ব । তাই, মানব জীবনের সুখ, শান্তি ইত্যাদি পাওয়ার বদলে কিচ্ছু না চাওয়ার মধ্যেই রয়েছে নিহিত । এইভাবে বিশ্বপরিচয়ের রচয়িতা এই কবি মানব সমাজে প্রাকৃতিক নিয়ম প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন যেন কোথাও, আবার আধ্যাত্মবাদীদের কাছে একই রচনা আধাত্মচেতনায়ও ভরে ওঠে ।